Sunday, September 8, 2024
Home News হল অব ফেম

হল অব ফেম

সুমন চট্টোপাধ্যায়

প্রথমেই পরপর কয়েকটি নাম লিখে ফেলা যাক।
ইদি আমিন, উগান্ডা
মহম্মদ রাজা পহলভি, ইরান
ফার্দিনান্দ মার্কোস, ফিলিপিন্স
ফুলজেনসিও বাতিস্তা, কিউবা
মবুটো সেসে সেকো, কঙ্গো
জিনে আল আবিদিন বেন আলি, তিউনিশিয়া
গোতাবায়া রাজাপক্ষ, শ্রীলঙ্কা

দেশ, মহাদেশ, ভাষা, গাত্রবর্ণ সব কিছু পৃথক, কেবল একটি বিষয়ে এই সাত জনের মধ্যে অত্যাশ্চর্য মিল। বেশ কিছুকাল স্বেচ্ছাচরী শাসন চালানোর পরে প্রবল জনরোষের মধ্যে এদের দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছিল।
রাজাপক্ষর প্রসঙ্গে পরে আসা যাবে। তার আগে প্রথম ছ’জনের স্বর্ণ-শাসনের কিস্‌সার উপর এক ঝলক চোখ বোলানো যাক।

ইদি আমিন উগান্ডার প্রেসিডেন্ট ছিলেন ১৯৭১ থেকে ১৯৭৯। তিনি ছিলেন একাধারে শিয়ালের মতো ধূর্ত আর বাঘের মতো নরখাদক। স্বদেশে তাঁর নামই হয়ে গিয়েছিল, উগান্ডার কসাই। গপ্পো আছে ইদি আমিন নাকি তাঁর বিরোধীদের কাটা মুন্ডু মস্ত বড় ফ্রিজে রেখে দিতেন বেশ কিছুদিন। তারপর হঠাৎ হঠাৎ দরজা খুলে কোনও একটি নরমুন্ডের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলতেন, তুই এই জঘন্য কম্মটি করেছিস, তাই এই শাস্তি পেয়েছিস। সংখ্যাতত্ত্ব বলে, তাঁর আট বছরের জমানায় আমিন অন্তত তিন লাখ মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী ছিলেন। তিনি লিবিয়ার আর এক স্বেচ্ছাচারী শাসক মুয়াম্মার গদ্দাফির বন্ধু ছিলেন, ১৯৭৬-এ এয়ার ফ্রান্সের বিমান ছিনতাইয়ে তাঁর গোপন মদত ছিল। ১৯৭৮-এ তিনি উগান্ডার সেনাবাহিনীকে তানজানিয়া আক্রমণের আদেশ দেন, সেটা ব্যর্থ হয়। তারপরেই ধূমায়িত জনরোষ দেখে তিনি দেশ ছেড়ে ভাগলবা হন লিবিয়াতে। পরে চলে যান সৌদি আরবে। সেখানেই ২০০৩ সালে এই নর-পিশাচের মৃত্যু হয়।

মহম্মদ রাজা পহলভিকে জগৎ চেনে ইরানের শাহ হিসেবে। তাঁর রাজত্বকালের মেয়াদ তিন দশকেরও বেশি, ১৯৪১ থেকে ১৯৭৯। তাঁর বিরুদ্ধে গণহত্যা বা প্রজা-নিপীড়নের কোনও রেকর্ড ছিল না, খুল্লাম খুল্লা আমেরিকার স্তাবকতা করে আর ইরানের মতো রক্ষণশীল দেশে পাশ্চাত্য সংস্কৃতি আমদানি করতে গিয়ে তিনি নিজের সর্বনাশ ডেকে এনেছিলেন। আমেরিকার মদতে ইরানে তিনি ‘শ্বেত বিপ্লব’ কায়েম করতে গিয়েছিলেন যার মূল লক্ষ্য ছিল আধুনিকীকরণ, দেশের পরিকাঠামোর ও শিল্পের। এবং দেশকে ম্যালেরিয়া মুক্ত করার।

ইরানের শিয়া ধর্মযাজক ও ছাত্র সমাজ শাহের বিরোধিতা করতে শুরু করেন, তাদের সমালোচনা ধীরে ধীরে তীব্র থেকে তীব্রতর হয়। ১৯৭৮ সালে শিয়া ধর্মগুরু আয়াতোল্লা খোমেইনির নেতৃত্বে ইরানে শুরু হয় বিপ্লব। পরের বছরই শাহ পালিয়ে বাঁচেন, প্রথমে মিশরে আশ্রয় নেন, সেখান থেকে মরোক্কোয়, তারপর বাহামায়, সবশেষে মেক্সিকোয়। একই বছরে ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য তাঁকে আমেরিকাতেও যেতে হয়। অসুস্থ শরীরে ইরানের শাহ ফের সেখানে ফিরে আসেন যেখানে তিনি প্রথম আশ্রয়প্রার্থী হয়েছিলেন- মিশর। সেখানে ১৯৮০ সালে মাত্র ৬০ বছর বয়সে তিনি মারা যান।

ফার্দিনান্দ মার্কোস একাধারে ফিলিপিন্সের প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট ছিলেন দীর্ঘকাল। ১৯৬৫ থেকে ১৯৮৬। পেশায় আইনজীবী। তাঁর শাসনকালের মাঝ বরাবর তাঁর বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতি আর গণতন্ত্রকে পদপিষ্ট করার অভিযোগ উঠতে থাকে। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সাত বছর পরেই তিনি ফিলিপিন্সে সামরিক শাসন জারি করেন, অনেক বিরোধী নেতাকে জেলে পাঠানো হয়। ১৯৮১ সালে তিনি সামরিক শাসন প্রত্যাহার করলেও সে বছরই ফের দেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

মার্কোসের পায়ের তলার জমি দ্রুত সরতে শুরু করে ১৯৮৩ সাল থেকেই। প্রধান বিরোধী নেতা বেনজিনো অ্যাকুইনোর আকস্মিক হত্যাকাণ্ডে তাঁর নাম জড়িয়ে পরে। এতৎসত্ত্বেও ১৯৮৬ সালে আকুইনোর পত্নীকে পরাজিত করে তিনি ফের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। কিন্তু মাদাম আকুইনো ভোটে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ আনেন, ফিলিপিন্সে জনরোষের আগ্নেয়গিরির মুখ খুলে যায়। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে তিনি হাওয়াইয়ে পালিয়ে যান, সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। ইতিহাসের এমনি পরিহাস সেই মার্কোসের পুত্রই এ বছর জুন মাসে ফিলিপিন্সের নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন।

বাতিস্তা কিউবা শাসন করেছেন দুই দফায়। প্রথমবার ১৯৩৩ থেকে ১৯৪৪, এই এগারো বছর এবং দ্বিতীয় দফায় ১৯৫২ থেক ১৯৫৯, মানে বছর সাতেক। তিনি ক্ষমতায় এসেছিলেন কার্লস ম্যানুয়েলের বিদ্রোহ সংগঠিত করে তাঁকে উৎখাত করার পরে। প্রথম দফায় বাতিস্তার প্রশাসন নিয়ে কোনও অভিযোগ ছিল না, শান্তি ও প্রগতির জন্য তিনি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। নাগরিক সমাজ এবং সামরিক বাহিনী উভয়েই তাঁকে সমর্থন করেছিল। ১৯৪০ সালে তিনি কিউবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন, চার বছর পরে কার্যকালের মেয়াদ ফুরোলে তিনি মার্কিন মুলুকে চলে যান সেখানেই স্থায়ী ভাবে থাকবেন বলে।

তাঁর অনুপস্থিতিতে কিউবায় আবার নৈরাজ্য ফিরে আসে, শাসন ক্ষমতা চলে যায় দুর্নীতিগ্রস্তদের হাতে। এই পরিস্থিতিতে ১৯৫২ সালে বাতিস্তা স্বদেশে ফেরেন এবং রক্তহীন অভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে কার্লস সকারসকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। কিন্তু দ্বিতীয় দফায় বাতিস্তা নতুন রূপ ধারণ করেন, তাঁর বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণ অর্থ তছরুপের অভিযোগ ওঠে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অবদমিত হয়। ১৯৫৪ ও ‘৫৮-র প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দেখা যায় বাতিস্তা একাই প্রার্থী, তাঁর কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। ১৯৫৮য় রঙ্গমঞ্চে আসেন ফিদেল কাস্ত্রো, তাঁর নেতৃত্বাধীন বিপ্লবের মুখে বাতিস্তার শাসন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। পরের বছরই দেশান্তরী হয়ে বাতিস্তা প্রথমে যান ডমিনিকান রিপাবলিকে, সেখান থেকে পর্তুগালে।১৯৭৩ সালে তাঁর মৃত্যুর খবর আসে স্প্যানিশ প্রদেশ মালাগা থেকে।

জায়ের পরে নাম বদলে কঙ্গোর প্রেসিডেন্ট ছিলেন মবুটো সেসো, টানা বত্রিশ বছর (১৯৬৫-১৯৯৭)। জীবনের শুরুতে তিনি পেশাদার সাংবাদিক ছিলেন, একটি জনপ্রিয় সাপ্তাহিকের সম্পাদনাও করেছিলেন। ১৯৬০ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে প্রথম প্রেসিডেন্ট জোসেফ কাসাভুভু তাঁকে জাতীয় নিরাপত্তার ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি অব স্টেটের পদে নিয়োগ করেন। পরে তাঁকে দেশের সামরিক বাহিনীর কমান্ডার ইন চিফ করা হয়। ১৯৬৫ সালে কাসাভুভুকে উৎখাত করে তিনি দেশের প্রেসিডেন্ট হন। কিন্তু তাঁর প্রশাসনের মধ্যভাগ থেকেই উঠতে থাকে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ, শুরু হয় বিশৃঙ্খলা। অভিযোগ ওঠে কঙ্গোর মাটি ব্যবহার করে প্রতিবেশীদের উপর নজরদারি করার সুবিধে করে দেওয়ার জন্য পশ্চিমী দেশগুলি মবুটোকে নিয়মিত ঘুষ দিত। জনরোষ চরমসীমায় পৌঁছলে তিনি দেশত্যাগ করে প্রথমে টোগোয় পালিয়ে যান লেখান থেকে মরক্কোয়।

জিনে অল-আবিদিন বেন আলি তিউনিশিয়ার প্রেসিডেন্ট ছিলেন ১৯৮৭ থেকে ২০১১। তার আগে ১৯৬৪ থেকে ১৯৭৪ তিনি ছিলেন দেশের সেনাপ্রধান। মরক্কোয় তিউনিশিয়ার দূতাবাসে তাঁকে মিলিটারি অ্যাটাচে করা হয়। পরে তিনি পোল্ডান্ডে যান রাষ্ট্রদূত হয়ে। ১৯৮৭ সালে দেশের প্রেসিডেন্ট বেন আলিকে প্রধানমন্ত্রীর পদে মনোনীত করেন। অচিরেই তিউনিশিয়ার রাজনীতি তিনি নিজের বজ্রমুষ্টির মধ্যে নিয়ে আসার চেষ্টা করেন, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও গণতন্ত্রকে হত্যার অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। আরবে গণ-আন্দোলন শুরু হওয়ার ঠিক আগে তিউনিশিয়ায় তার সলতে পাকানো হয়েছিল, বেন আলি ভয়ে সৌদি আরবে পালিয়ে যান। তাঁর অনুপস্থিতিতেই আলির বিচার হয় তিউনিশিয়ায়, বেশ কয়েকটি অপরাধে তাঁকে একাধিক মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ২০১১-য়, জেড্ডা থেকে তাঁর মৃত্যুর খবর আসে।

এই তালিকায় সর্বশেষ সংযোজন শ্রীলঙ্কা থেকে পলাতক পদত্যাগী প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপক্ষ। যে হল অব ফেমের তিনি অংশ হয়ে গেলেন তাঁদের কেউ আর স্বদেশে ফিরতে পারেননি। গোতাবায়া কি পারবেন? (আগামীকাল)

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

রোশনী মুখোপাধ্যায় on ফেয়ার অ্যান্ড লাভলির দেশ
অভিষেক মল্লিক on এবার দ্যাখ কেমন লাগে
Anupam Bhattacharyya on ব্রাজিল! (২)
অভিষেক মল্লিক on ওরে বাবা ব্রাজিল!
Partha Chakraborty on নীল সামুরাই
Manju Bhattacharjee on আমার জম্মোদিন
শুভাশীষ কবীর আইচ। on আমার জম্মোদিন
নবনীতা বসু হক on আমার জম্মোদিন
নীলার্ণব চক্রবর্তী on আমার জম্মোদিন
রোশনী মুখোপাধ্যায় on আমার জম্মোদিন
শুভাশিস ঘোষ on এ সত‍্য সকলি সত‍্য
শুভ্রেন্দু রায় on মহারাজ একী সাজ হে
কৌশিক শীট। on মহারাজ একী সাজ হে
মিহির গাংগুলী on মহারাজ একী সাজ হে
তাপস কুমার পাল on মহারাজ একী সাজ হে
অপূর্ব গঙ্গোপাধ্যায় on মহারাজ একী সাজ হে
শুভাশীষ কবীর আইচ। on মহারাজ একী সাজ হে
কল্যাণ সেনগুপ্ত on আহত পুতিন আরও বিপজ্জনক
অপূর্ব গঙ্গোপাধ্যায় on কী খাবে জানি, কী খাওয়া উচিত জানিনা
অপূর্ব গঙ্গোপাধ্যায় on রাণী গেলেন, অতঃকিম?
siddhartha ghosh on বসন্ত বিলাপ
Sanghamitra Roychowdhury on হাদি থেকে জেহাদি